শিক্ষার্থীদের শেখানো পথে নেই পুলিশ

শিক্ষার্থীদের শেখানো পথে নেই পুলিশ

ঢাকা, ০৬ আগস্ট- আছে রিকশা, মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাসসহ অন্যান্য যানবাহন। কিন্তু কেউই ট্রাফিক আইন মানছে না। পুলিশ কনস্টেবল ওসমান গনি দুই হাত প্রসারিত করে সিগন্যাল দিলেও কেউ তা দেখছে না। গতকাল রবিবার দুপুর ২টার দিকে গুলিস্তান জিরো পয়েন্টের ট্রাফিক মোড়ে দাঁড়িয়ে দেখা গেল এ দৃশ্য। অথচ এর এক ঘণ্টা আগে দুপুর ১টার দিকেই শুরু হয়েছে ট্রাফিক পুলিশ সপ্তাহ। গত ২৯ জুলাই কুর্মিটোলায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের পর শিক্ষার্থীরা সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে অবস্থান নিয়ে লাইসেন্স যাচাইসহ শৃঙ্খলা তৈরির কাজ করছিল। এই প্রতিবাদকে প্রতীকী ও দৃষ্টান্তমূলক বলছে সবাই। পুলিশও সেটি স্বীকার করে গতকাল থেকে ট্রাফিক পুলিশ সপ্তাহ পালন করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর ঘোষণা দেয়।

দায়িত্বরত কনস্টেবল ওসমান গনি বলেন, ‘কোমলমতি সন্তানরা টানা সাত দিন ধরে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে সবাইকে আইন মানার যে দাবি জানিয়ে আসছে, বাস্তবে তা কেউই কি মানে? এই শিক্ষার্থীরা তো এই আইন অমান্যকারীদেরই সন্তান।

’ ঠিক ওই সময় একটি প্রাইভেট কার ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করে সামনের দিকে আগাচ্ছিল। হাত তুলতেই চালক থেমে যান। চালক জানালা খুলে পেছনের দিকে ইশারা করেন। তখন পেছনের সিটে বসে থাকা সালাউদ্দিন নামে এক ভদ্রলোকের কাছে ট্রাফিক অমান্য করার কারণ জানতে চাইলে তিনি রেগে বলে ওঠেন, ‘আপনি রাস্তা ছাড়েন, আমার তাড়া আছে। ’ এ সময় ট্রাফিক পরিদর্শক (টিআই) আশপাশে ছিলেন না। সার্জেন্ট রেদওয়ান দূরে ছিলেন। তাঁর কাছে গিয়ে এ নিয়ে কথা বলতেই আক্ষেপ করে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘সকাল থেকে এখানে দাঁড়িয়ে আছি সড়কে শৃঙ্খলা আনতে। এক দিক সামাল দিলে অন্য দিক দিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল অর্থাৎ আইন অমান্য করে চলে যায়। ’
গতকাল উত্তরা, ফার্মগেট, বনানী, নীলক্ষেত ও মিরপুর এলাকায় ট্রাফিক পুলিশকে কঠোর অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। তবে মতিঝিল, শাহবাগ, গুলশান, প্রগতি সরণি, তেজগাঁও, কারওয়ান বাজার ও মিরপুর সড়কে ঢিলেঢালা অবস্থা দেখা গেছে। যেসব সড়কে শিক্ষার্থীরা নামেনি সেখানে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে। কম যানবাহন থাকলেও রাস্তায় যানজট দেখা গেছে। কয়েকটি রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশই ছিল না।

জিরো পয়েন্ট সিগন্যালে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করে দেখা যায়, সড়কে বাস না থাকলেও ছিল বিশৃঙ্খলা। পল্টন মোড়ের আটটি পয়েন্ট দিয়ে সব সময় গাড়ি চলছে। সব সময় এই এলাকায় যানজট লেগেই থাকছিল। ট্রাফিক মোড়গুলোতে কোনো ট্রাফিক বাতি নেই। সেখানকার ট্রাফিক ইন্সপেক্টর জিয়াউদ্দিন খান বলেন, ‘সকাল থেকে আমরা রাস্তার শৃঙ্খলার জন্য চেষ্টা করি। কিন্তু সাধারণ জনগণের মধ্যে এখনো আইন মানার অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। তারা ট্রাফিক সিগন্যালও মানতে চায় না। ’

সরেজমিনে বিজয়নগর, কাকরাইল, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে, শাহবাগ, বাংলামোটর, মগবাজার, মহাখালীসহ বেশির ভাগ সড়কে ঘুরে নিয়ম ভাঙার মহোৎসব দেখা গেছে। ট্রাফিক পুলিশ ছোট যানবাহনগুলোর কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে অনেক মামলা দিয়েছে। কালশীতে দায়িত্বরত রুবেল নামে ট্রাফিক পুলিশের এক সদস্য বলেন, ‘বলতে পারেন বাচ্চাদেরটা দেখে শিখেছি। রাস্তায় গাড়ি কম তাই বেশি তল্লাশি করা যায়। এ কারণে করছি। পরে আসলে এভাবে করা যাবে না। ’

সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উত্তরা ও বিমানবন্দর এলাকায় প্রায় প্রতিটি যানবাহনই ব্যাপক তল্লাশি চালায় পুলিশ। এই সময় প্রায় দেড় শতাধিক যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আবার কিছু যানবাহন রেকার লাগিয়ে জরিমানাও আদায় করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা লেন বাই লেনে যানবাহন চালানোর নিয়ম করলেও পুলিশ তা করতে পারেনি।   

জসিম উদ্দিন রোডে দেখা গেছে, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্টরা বিভিন্ন যানবাহন আটকে কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেলের আরোহীদের বেশি তল্লাশি করা হয়। মোটরসাইকেলের পেছনে আরেকজন থাকলে তার মাথায় হেলমেট না থাকলে মামলা ঠুকে দেন সার্জেন্টরা। মোটরসাইকেল আরোহী মাহবুব আলম বলেন, ‘আমার মোটরসাইকেলের পেছনে ছোট ভাই ছিল। কিন্তু তার মাথায় হেলমেট ছিল না। ট্রাফিক পুলিশ এর কারণ জানতে চায়। পুলিশের কাছে ক্ষমা চেয়েও রক্ষা পাইনি। সার্জেন্ট মামলা দিয়েই ছাড়ল। ২০০ টাকার জরিমানা করা হয়েছে। তবে মামলা করলেও কোনো রাগ অভিমান নেই। শিক্ষার্থীরা পুলিশকে যে পথ দেখিয়েছেন তা যেন কার্যকর হয়।

এ প্রসঙ্গে ট্রাফিক ইন্সপেক্টর ফারুক আহমেদ বলেন, ‘ট্রাফিক সপ্তাহে পুলিশ কঠোর থাকবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ভিআইপি-সিআইপিও আইন অমান্য করলে কোনো রেহাই দেওয়া হবে না। শিক্ষার্থীরা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছেন। সবাই যদি আমাদের সহায়তা করে তাহলে অল্প সময়েই ট্রাফিক সিস্টেম ভালোভাবেই চলবে। ’ তিনি বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকাল থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রায় ৭০টির মতো মামলা হয়েছে। ’ এদিকে বিমানবন্দর গোল চত্বরের সামনে গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রায় ৮০টির মতো মামলা হয়েছে। বিমানবন্দর পুলিশ বক্সের এক সার্জেন্ট বলেন, ‘লেন বাই লেন যানবাহন চালানো হয়নি। আজ থেকে তা করা হতে পারে। তবে ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে আমরা কঠোর। যাদের লাইসেন্স বা কাগজপত্র থাকবে না তাদের সর্বোচ্চ আইনেই মামলা করা হচ্ছে। ’

মতিঝিলের চেকপোস্টে গতকাল বিকেলে দায়িত্ব পালন করছিলেন সার্জেন্ট আজিজুর রহমান। তিনি  জানান, অন্য সময় যেমন গাড়ির কাগজপত্র কম পাওয়া যায়, এখন সেরকমটা দেখা যাচ্ছে না। সকাল থেকে ৩০-৪০টা গাড়ির মধ্যে তিন-চারটার কাগজপত্রে সমস্যা পাওয়া গেছে।

গতকাল রাজধানীর গুলিস্তান জিরো পয়েন্টে ট্রাফিক সপ্তাহের উদ্বোধনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়াসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের ৯টি দাবির মধ্যে সাতটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বাকি দুটি দাবি আইনগত হওয়ায় সোমবার কেবিনেট মিটিংয়ে বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে আইজিপি বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে ট্রাফিক আইন ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন করাটাই এই ট্রাফিক সপ্তাহের মূল উদ্দেশ্য। ’

ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ রোভার স্কাউট ও গার্লস গাইড ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে ট্রাফিক সপ্তাহে কাজ করবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। তার মানে এই নয় যে তারা অরাজকতা করতেই থাকবে, আর আমরা দৃশ্য দেখতে থাকব। আমাদেরও ধৈর্যের সীমা রয়েছে। সেটা অতিক্রম করলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

তথ্যসূত্র: কালেরকণ্ঠ

READ  গোরস্থানের পাশে ‘ভিক্ষার সিট’ ১০০ টাকা

Leave a Reply

%d bloggers like this: