‘কেউ শোনে না আমাগো কথা, দালাল ছাড়া পাইনা ফেরির টিকিট’

Image result for ‘কেউ শোনে না আমাগো কথা, দালাল ছাড়া পাইনা ফেরির টিকিট’

দেশের পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত দৌলতদিয়া নৌরুট। আর ঈদকে সামনে রেখে ফেরির টিকিটের মাধ্যমে শুরু হয়েছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। এ ঘাটে যাত্রীবাহী ছোট বড় ও পাকিং করা ট্রাকসহ সব ধরনের মালবাহী যানবাহনের চালকদের কাছ থেকে এ চাঁদা নেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ট্রাক চালকদের।

পদ্মা নদীতে পানি বাড়ার সাথে স্রোত বেড়ে যাওয়ায় ৩০মিনিটের যায়গায় নদী পারাপারে সময় লাগছে ১ঘন্টা। এসব কারণে দৌলতদিয়া ঘাটে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে সাধারন যাত্রী ও যানবাহনের চালকরা।

বিআইডব্লিউটিসি বলছে ১৮টি ফেরি চলাচল করছে কিন্তু পুলিশ বলছে ১৫টি..? স্থানীয় সুত্র মতে পুলিশের দেওয়া তথ্যই সঠিক।

দৌলতদিয়া ঘট এলাকায় রাজনীতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় একটি সংঘবদ্ধ দালাল চক্র এ চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বলে পরিবহন চালকদের অভিযোগ। ফেরির টিকিট দালালদের মাধ্যমে না নিলে-চাঁদা না দিলে চালকদের প্রহার করা হয় বলেও তারা অভিযোগ করেন।

দীর্ঘদিন ধরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌরুট দৌলতদিয়া ঘাটের বিআইডব্লিউটিসি’র ট্রাক বুকিং কাউন্টার ঘিরে সক্রিয় রয়েছে প্রভাবশালী দালাল চক্র। এ চক্রের মাধ্যম ছাড়া কোন পন্যবাহি ট্রাক ফেরি টিকিট পায়না বলে অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নদীতে তীব্র স্রোত, ঘাট সমস্যায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে স্বাভাবিক যানবাহন পারাপার ব্যাহত হচ্ছে। ঘাটে এসে ফেরি পাড়াপারের জন্য গাড়িগুলোকে দীর্ঘ সময় সিরিয়ালে আটকে থাকতে হচ্ছে। যাত্রীবাহি ও কাচামালের যানবাহনগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নদী পারাপার করলেও বাজেমালবাহি বা খালি ট্রাক গুলোকে ফেরির দেখা পেতে ৫/৬দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

১৩ আগস্ট সোমবার দুপুরে ঘাট এলাকায় দেখা যায়, ৩/৪ দিন ধরে সিরিয়ালে আটকে আছে কয়েকশ পণ্যবাহি ও বাজে মালের ট্রাক এবং শতাধিক যাত্রীবাহী কোচ পারাপরের অপেক্ষায় রয়েছে। এতে দৌলতদিয়া ঘাটের বিশাল টার্মিনাল ট্রাক পার্কিং ইয়ার্ড উপচে ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে মহাসড়কের ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত অন্তত সাড়ে ৩ কিলোমিটার জুড়ে ট্রাকের দীর্ঘ সারি। গত ১২ আগস্ট রোববারও ছিলো একই চিত্র।

আর এই সুযোগে ঘাট এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় স্থানীয় প্রভাবশালী দালাল চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এসকল দালালরা বিআইডব্লিউটিসি’র ট্রাক বুকিং কাউন্টিারের অসাধু কর্মচারীদের আতআত করে ট্রাক চালকদের কাছ থেকে ফেরির টিকিট বাবদ নির্ধারিত ভাড়ার কয়েক গুন বেশি টাকা আদায় করছে।

একাধিক ট্রাকচালকরা অভিযোগ করে বলেন, দালাল না ধরলে এখানে ফেরির টিকিট পাওয়া যায় না। পাশাপাশি দালাল না ধরে কাউন্টারে টিকিটের জন্য গেলে তাদেরকে টিকিট না দিয়ে ফিরিয়ে দেয় বিআইডব্লিউটিসি’র ট্রাক বুকিং কাউন্টিারে দায়ীত্বে থাকা লোক জন।

ঘাটে সিরিয়ালে আটকে থাকা : ঝিনাইদাহ কালিগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা গ্রামী চাউল বোঝায় ট্রাক (নং ঢাকা মেট্রো ১৬ ০৯৬৫) চালক মোঃ রুবেল হোসেন জানান, দৌলতদিয়া ঘাটে কেউ শোনে না আমাদের মত ট্রাক চালকদের কথা খেয়ে আছি কি না খেয়ে আছি, কেউ দেখে না আমাদের কষ্ট দালালের যন্ত্রনা এক রকম আবার পুলিশের যন্ত্রনা আরেক রকম। কারন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ফেরির টিকিট নিলেও সেটি নিয়ে নেন পুলিশ।টিকিট নিয়েই ট্রাক টার্মিনালে বসি রাখে ২/৩দিন। ৪দিন যাবত এ ঘাটে চাউল বোঝাই ট্রাক নিয়ে বসে আছি, ২দিনের মাথায় ফেরির টিকিট নিজে নিতে না পেরে বাধ্য হয়ে দালালের মাধ্যমে ১০৬০ টাকার টিকিট ২০৫০ টাকার বিনিময়ে কিনেছি। তার পরেও বসে আছি কারন ফেরির টিকিট পুলিশ নিয়ে ট্রাক টার্মিনালে বসিয়ে রেখেছে সিরিয়াল অনুযায়ী টিকিট দিবে। জানি না কখন বা কবে দিবে আর কত দিন থাকতে হবে ঘাটে। আমার মত এখানে অসংখ্য ট্রাক চালক আছে যাদের কাছে এখন খাওয়ার টাকাও নেই। কোন রকমে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছি আমরা। গোসল করার কোন স্থান নেই। নেই কোন ঘুমানোর ব্যবস্থ আমরা যারা ট্রাক চালক আমাদের কে মানুষ বলেই মনে করে না কেউ।

পল্লী বিদ্যুৎ এর মালামাল বোঝাই কাভার্ড ভ্যান (নং ঢাকা মেট্রো ঠ ১৪-১৮০৮) চালক বাদল মোঃ জয়নাল আবেদিন জানান, ৪দিন যাবত আটকে থাকার পর দালালদের মাধ্যমে (৭৪০টাকার টিকিট ১২০০) টাকার বিনিময়ে ফেরির টিকিট হাতে পেয়েছেন। টিকিটের গায়ে মূল্য লেখা আছে ৭৪০টাকা। এরপর ফেরি ঘাট পর্যন্ত যেতে কত পয়েন্টে টাকা দিতে হবে তার ঠিক নেই। এর আগে গোয়ালন্দ মোড় এলাকায় এক দিন সিরিয়ালে আটকে থেকে হাইওয়ে পুলিশকে ৩০০টাকা দিয়ে দৌলতদিয়া ঘাটে আসতে পেরেছি। এখানে এসেও লাভ হয়নি ফেরির টিকি এখন পুলিশের হাতে দিয়ে টার্মিনালে বসে আছি জানি না কবে কখন পার হতে পারবো।

ফরিদপুর থেকে আসা মেঘনা গ্রুপের ফ্রেস দুধ বোঝাই ট্রাক (নং ঢাকা মেট্রো উ ১২-১৪৫৬) চালক মোঃ বাকি উল্লাহ বলেন, দালালদের ছাড়া দৌলতদিয়া ফেরি ঘাটে কোনদিনও ফেরির টিকিট পাওয়া যায় না। ঘাট ফাঁকা থাকলেও টিকিটের জন্য দালাল ধরতে হয়। আর এখন তো লম্বা সিরিয়াল। তিনি ১৪৬০ টাকার টিকিট দালালদের মাধ্যমে ১৮০০টাকা দিয়ে নিতে হয়েছে। এ সময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাংবাদিকদের কাছে বলে কোন লাভ হয় না, আরো বিপদ ডেকে আনা। কারণ সাংবাদিকরা গাড়ির নম্বর সহ পত্রিকায় প্রকাশ করে, এতে পববর্তীতে ঘাটে এসে ঝামেলায় পড়তে হয় আমাদের।

সরেজমিনে দৌলতদিয়া ঘাট ঘুরে দেখা যায়, সহস্রাধিক গাড়ি নদী পারাপারের অপেক্ষায় মহাসড়কে দুই সারিতে দাঁড়িয়ে আছে। ফোরলেন সড়কের বাম পাশে ট্রাকের সারি মডেল হাই স্কুল পর্যন্ত আর ডান পাশ দিয়ে দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত যাত্রীবাহি বাসের সারি। আটকে থাকা গাড়ির মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যাই বেশি।

এ সময় ভুক্তভোগী ট্রাকচালকরা অভিযোগ করেন, বিআইডব্লিউটিসি’র কাউন্টার থেকে প্রতিটি ট্রাক পারাপারে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার মূল্যের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে দীর্ঘ দিন যাবত। এ ঘাটে দালাল না ধরলে কখনো ফেরির টিকিট পাওয়া যায় না। দালাল না ধরলেই পড়তে হয় বিভিন্ন ঝামেলায়। তাই স্থানীয় দালাল ধরে অতিরিক্ত টাকায় ফেরির টিকিট কিনতে বাধ্য হই।

কেউ কেউ আবার পুলিশকেও দোসারফ করে বলেন, পুলিশও দালালদের সাথে জড়িত তা না হলে দীর্ঘ দিন যাবত ঘাটে দালাল চক্র এভাবে ফেরির টিকিট নিয়ে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে বিক্তি করছে..? বিআইডব্লিউটিসি’র কাউন্টার থেকে কি ভাবে দালালরা টিকিট পায়..? আমারা ট্রাক চালকরা কাউন্টারে গেলে আমাদের কাছে কোন টিকিট দেয় না। পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোন লাভ হয় না। তাছাড়ও পুলিশের কিছু অসাধু সদস্য আছে তারাও আমাদের কে বলে আগে যদি যেতে চাও তাহলে টাকা দাও নইলে বসে থাকো। তাহলে আমারা কোথায় যাবো এমন চাঁদাবাজী চললে কি ভাবে এই দেশ ডিজিটাল হবে..? বলেই প্রশ্ন ছুড়ে দেন ট্রাক চালকরা।

রাজবাড়ী ট্রাফিক পুলিশের টিআই মোঃ আবুল হোসেন চালকদের অভিযোগ অস্কিার করে বলেন, ঘাট এলাকায় পুলিশের পক্ষ থেকে কোন চাঁদা নেওয়া হয় না। তবে হে ঘাট এলাকায় কিছু দালাল চক্র আছে ট্রাক চালকরা ঐ সকল দালালদের মাধ্যমে টিকিট কিনে আর দোষ চাপায় পুলিশের উপড়ে এটা নতুন কিছু নয়, কারন পুলিশই এক মাত্র সরকারি কর্মচারী যাদের কাজের সমালোচনা মানুষ একটু বেশিই করে। আর ঘাট এলাকাকে দালাল মুক্ত রাখতে পুলিশ সব সময় কাজ করছে। তার পরেও ট্রাক চালকরা কি ভাবে দালালের কাছে যায় এটা এক মাত্র তারাই বলতে পারবে। ফেরির টিকিট নিয়ে টার্মিনালে ট্রাক চালকদের কে বসিয়ে রাখার বিষয়ে টিআই বলেন, কাচামাল, গুরু বোঝাই ট্রাক এবং যাত্রীবাহী বাস গুলোকে অগ্রঅধিকার ভিত্তিতে পার করতে হয়। তাই যখন এসকল যানবাহন যখন বেশি থাকে তখন অ-পচনশিল ও বাজে মালের ট্রাক গুলোকে টার্মিনালে বসিয়ে রাখা হয়। এদিকে গাড়ি কমলে তাদের কে সিরিয়াল অনুযায়ী ছাড়া হয়।

বিআইডবি¬উটিসি দৌলতদিয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, সরকার নির্ধারিত ফেরি ভাড়া অনুযায়ী প্রতিটি সাধারণ ট্রাক ১০৬০ টাকা এবং বড় আকারের ট্রাক ১৪৬০ টাকা। তবে নির্ধারিত ওজনের চেয়ে বেশি পণ্য বহন করলে অতিরিক্ত ওজনের জন্য প্রতি টন ১২০ টাকা হারে মূল টিকিট মূল্যের সাথে যোগ হয়। এ জন্য ডিজিটাল ওয়েস্কেলের মাধ্যমে ফেরি পার হতে আসা প্রতিটি ট্রাকের সঠিক ওজন পরিমাপ করা হয়। স্কেল থেকে দেওয়া ওজন স্লিপ অনুযায়ী প্রতিটি ট্রাকের ফেরি ভাড়া আদায় করা হয়।

বিআইডব্লিউটিসি’র দৌলতদিয়া ঘাট ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম অভিযোগের বিষয় অস্কিার করে বলেন, ট্রাক চালকদের কাছে সরাসরি টিকিট বিক্রি করা হয়। সরকার নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত টাকা আদায়ের কোন সুযোগ নেই। দালালচক্রকে নিয়ন্ত্রন করতে ট্রাক বুকিং কাউন্টারে সার্বক্ষনিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী পাহাড়ায় থাকে।

READ  রাষ্ট্রপতি হিসেবে আব্দুল হামিদ কেমন জনপ্রিয়?

Leave a Reply

%d bloggers like this: