মানুষের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ

 

গোলাপ মুনীর

যদি আপনার চাকরিটা চলে যায়, তবে বেঁচে থাকার জন্য বাড়িটা বিক্রি করে দিতে পারেন। বাড়িটা হারানোর পরও যদি সংসার না চলে, তবে নিজের কিছু মালামাল বিক্রি করতে পারেন। এভাবে সবকিছু হারিয়ে যদি শুধু শরীরটা থাকে, তবে বিক্রির জন্য অবশিষ্ট আপনার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।

এইতো গত এপ্রিলের প্রথম দুই সপ্তাহে সারা পৃথিবী থেকে অঙ্গ সংস্থান বিশেষজ্ঞরা দু’বার মিলিত হয়েছেন ইউরোপে। তাদের এই সমবেত হওয়ার উদ্দেশ্যে মানুষর বক্ত-মাংশের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিশ্ববাজার পর্যালোচনা। এই বৈঠক দু’টিতে দু’টি মানচিত্র উপস্থাপন করা হয়। একটি মানচিত্রে দেখানো হয় কোন কোন দেশ থেকে বিগত তিন বছর সময়ে অঙ্গ সংস্থানের জন্য রোগীরা এসেছে। এ দেশগুলোর মধ্যে আছি সৌদি আরব, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া। অন্য মানচিত্রটিতে দেখানো হয়েছে যেসব দেশের মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি হয়েছে। এসব দেশের তালিকায় আছে চীন, পাকিস্তান, কলম্বিয়া ও ফিলিপাইন।

মানচিত্র থেকে দেখা যায়, এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনা-বেচার সংখ্যা হাজার হাজার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া পরিসংখ্যান মতে, প্রতি বছর আন্তর্জাতিকভাবে শুধু কিডনি বদল হয় প্রায় ৬ হাজার। এর প্রমাণ মিলে দালালদের ও চিকিৎসকদের রিপোর্ট থেকে, ভারতীয় গ্রামগুলো থেকে পাওয়া হিসাব থেকে, জাপানের হাসপাতালগুলোতে পরিচালিত জরিপ থেকে, সিঙ্গাপুর সরকারের রেকর্ডপত্র থেকে এবং মিসরীয় বস্তিবাসীর দেশের ক্ষতের দাগ থেকে। পাকিস্তানের কিছু কিছু গ্রামের মানুষের ৪০ শতাংশই বেঁচে আছে একটি মাত্র কিডনি নিয়ে। উল্লিখিত মেটিংয়ে উপস্থাপিত চার্ট থেকে জানা যায়, এ ক্ষেত্রে অনাত্মীয় ডোনেশান’-এর সংখ্যা ক্রমেই আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানে যারা অন্যের কিডনি গ্রহণ করছে, তাদের দুই-তৃতীয়াংশই বিদেশী। ফিলিপাইনের বেলায়ও চিত্রটা একই।

প্রথম সফল অঙ্গ সংস্থানের কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল অর্ধ-শতাব্দী আগে। সেই থেকে প্রথম ডায়াবেটিস, হাইপারটেশন ও অন্যান্য কিডনি ধ্বংসকারী রোগ বিস্তার লাভ করেছে। এসবের অ্যান্টিবায়োটিক বা প্রতিষেধক ওষুধেরও উন্নয়ন সাধনও হয়েছে। তেমনি অন্য দেহের অঙ্গ সংস্থানের পর কোনো ধরনের সংক্রমণ যাতে না ঘটতে পারে, সে ধরনের ওষুধের উন্নয়ন ঘটেছে। এখন অনেক মানুষ অন্যের অঙ্গ নিজের দেহের ধারণ করে বেঁচে আছে। এভাবে অনেককে বাঁচিয়ে রাখাও সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু অঙ্গ দান বা অর্গান ডোনেশন চাহিদা অনুযায়ী তেমনটি রাখাও সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু অঙ্গ দান বা অর্গান ডোনেশন চাহিদা অনুযায়ী তেমনটি বাড়েনি।

একটি অনুমিত এক হিসাব মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ১ লাখ ৭০ হাজার রোগী এখন অঙ্গ সংস্থানের জন্য অপেক্ষমাণদের তালিকায় রয়েছে। ৭০ হাজারেরও বেশি আমেরিকান অপেক্ষায় আছে নিজেদের দেহে কিডনি স্থাপনের জন্য এবং তালিকায় প্রতি বছর যোগ হচ্ছে ৫ হাজার জন। কিডনির অভাবে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছেন।

এভাবে অপেক্ষায় না থেকে অনেক রোগী তাদের নিজস্ব ডোনার নিয়োগ করতে শুরু করেছে। এরা এ কাজ শুরু করেছে বিলবোর্ড টানানোর মাধ্যমে। কেউ কেউ শরণাপন্ন হয়েছেন ওয়েব সাইটের।   অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তাদের জন্য এক ধরনের সম্পদ। পেরুবিয়ান, ইউক্রেনিয়ান এবং আমেরিকান হাসপাতালগুলোতে লোকেরা তাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রচার করে। গত বছর একজন দক্ষিণ কোরীয় নাট্যকার ঋণের বিপরীতে তার কিডনি জামানত হিসেবে কাজে লাগায়।

রাজনীতিবিদরা এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাজার বশ করার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০ বছর আগে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। ভারতে তা নিষিদ্ধ হয়েছে ১৯৯৪ সালে। চীনে তা নিষিদ্ধ করা হয় গত বছর। কিন্তু জীবন যখন বিপন্ন হয়, তখন আইন আর কেউই মানতে চায় না। আরো বেশি অঙ্গ কেনার বেলায় চিকিৎসকের কিছু বিষয় অবাঞ্ছিত ধরে নিয়েছেন। যেমন ব্রেনডেথ স্ট্যান্ডার্ড, বয়সসীমা এবং গ্রহণকারীর স্বাস্থ্য উপযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট এজেন্সি অর্গান ট্রান্সপ্ল্যাট এজেন্সি তথা অঙ্গ সংস্থান সংস্থাগুলোকে রোগীদের ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণের অনুমোদন দিয়েছে। কংগ্রেস যদি অর্গান বিক্রি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত পাল্টায়, তবে অনেকে আশা করছেন কয়েদিরা তাদের অর্গান অথবা ম্যারোর বিনিময়ে শাস্তি মেয়াদ কমানোর সুযোগ পাবে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে জাতীয় সরকারগুলো যদি দাম ও মজুরি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে এরা নিশ্চয়ই সাম্প্রসারিত জীবন ক্রয়ের বিষয়টিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। গত দুই বছরে ইসরাইলি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায় দ্রুত সেবা যোগানোর উদ্দেশ্যে কলম্বিয়া থেকে চীনে স্থানান্তর করেছে। চীন যদি এর দুয়ার বন্ধ করে দেয়, তবে এরা আবার ব্যবসায়ের স্থান পরিবর্তন করতে পারে। পাকিস্তানে যে দামে কিডনি বিক্রি হয়, চীনা হাসপাতালে এর দাম আরো কয়েকগুণ বেশি। দালালরা দেশে দেশে কিডনির দামের তুলনা করতে পারে। ঠিক যেমনি দামের তুলনা চলে গম কিংবা অন্য কোনো খাদ্যশস্যের।

ইতোমধ্যেই মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা ভেঙে পড়েছে। যে ভারতীয় ২০০৪ সালের সুনামির সময় তাদের জীবন বাঁচানোর সব সহায়-সম্বল হারিয়ে ফেলে, তারা আইন উপেক্ষা করে তাদের কিডনি বিক্রি করেছে। বুলগেরিয়া কঠোর শাস্তি আরোপ করেছে কিডনি ব্যবসায়ীদের ওপর। তারপরও গত বছর ইসরাইল থেকে আসা কিডনি টুরিস্টদের ঠেকাতে পারেনি বুলগেরিয়া। চীনের নিষেধাজ্ঞাও একজন বিবিসি সংবাদদাতাকে লিভার বা যকৃত দানের ব্যাপারে থামাতে পারেনি একটি চীনা হাসপাতালকে। এই তো গত মার্চে একটি কোরীয় পত্রিকা খবর প্রকাশ করে বলেছে, কিডনি বেচার ওপর চীনের নিষেধাজ্ঞা শুধু কোরিয়ায় চীনাদের কিডনি বিক্রির দামটাই বাড়াতে সাহায্য করেছে। থামাতে পারেনি কিডনি বিক্রি।

কিছুসংখ্যক সংস্কারক মনে করেন, এরা অর্গানের ঘাটতি সমস্যার সমাধান করতে এবং এর বাজারও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। তবে তা করতে হবে অর্গান বিক্রি বৈধ করার মাধ্যমে। তাদের সর্বশেষ প্রস্তাব এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ইউরোপীয় বৈঠকে উপস্থাপিত হয়। মিনিসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আর্থার মাতাস। ড. মাতাস বলেন, একদিকে ডিম ও তৈলাক্ত পদার্থ ক্ষতিকর নয়, কিডনি কেনা দেশের অর্থ সাশ্রয় করতে পারে, গরিব মানুষকে কিডনির বদলে টাকা দেয়ার চেয়ে তাদের টাকা দিয়ে খনি কিংবা সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার কোনো অংশে খারাপ কিছু নয়। অপরদিকে তিনি মনে করেন, সরকার কিডনির দাম নির্ধারণসহ কে কিডনি গ্রহণ করবেন তাও নির্ধারণ করবেন।

সৌভাগ্য, জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা সমৃদ্ধ যেকোনো দেশ জানে, তাদের জন্য বরাদ্দের চেয়ে বেশি পরিমাণে জনসাধারণ কেনার উপায়টাও কী করে বের করতে হয়। অতএব, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি বৈধ করাই শ্রেয়। তবে কিডনি কেনাবেচা অবাধে চললে ‘কিডনি দান’ অনেকাংশে কমে যাবে। মানুষ তখন স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কিডনি দানে এগিয়ে আসতে চাইবে না।

আমেরিকান, ইসরাইলি, জাপানি ও দক্ষিণ কোরীয়রা বিদেশ চষে বেড়াচ্ছে কিডনি কেনার খোঁজে। কারণ, তাদের নিজেদের মানুষ কিডনি বিক্রিতে ততটা আগ্রহী নয়। এমনকি মৃত্যুর সময়েও এরা কিডনি বিক্রি করতে চায় না। কারো কারো মধ্যে কাজ করে ধর্মীয় বাধা। কেউ কেউ আবার খুঁতখুঁতে। কিডনি দিতে আছে ভয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, তারা যদি হিউম্যান অর্গান বা মানব অঙ্গ সরবরাহ না করে, তবে অন্য কেউ তো করবে। এটা সঠিক, অন্য কেউ না কেউ সরবরাহ করবে।

তবে সেই অন্য কেউ কোনো লাশ নয়। হতে পারে সে একজন জেলে, কিংবা কোনো বেকার, যার দরকার অর্থের এবং সে অর্থ যোগাড় করতে তার কাছে বিকল্প অন্য কোনো পথ নেই। মধ্যস্বত্বভোগী তার বুক চিরে কিডনি নিয়ে যাবে, এর দামের ভগ্নাংশ মাত্র তাকে দেবে। আর এর মাধ্যমে অকেজো করে দিয়ে যাবে। কারণ, ফলোআপ কেয়ার নিতে তাকে আরেকটি বাড়তি খরচের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়। যদি কেউ কিডনি দেয়ার পর আবার নিজেকে কাজের উপযোগী রাখতে পারে, তবে সে ব্যক্তি সৌভাগ্যবান।

কাউকে কিডনি বিক্রি থেকে থামানোর সবচেয়ে নিশ্চিত উপায় হচ্ছে, ফ্রি অর্গান দিয়ে বাজারে বন্যা বইয়ে দেয়ার মাধ্যমে কিডনি বিক্রিকে অর্থহীন করে তোলা। আপনি যদি এখনো কিডনি দানে ডোনার কার্ড পূরণ করে না থাকেন, তবে তা এখনই করুন। কারণ, একজন রোগী মৃত লাশ থেকে কোনো কিডনি সংগ্রহ করতে পারে না। তাকে তা সংগ্রহ করতে হয় একজন জীবিত কারো কাছ থেকে।

মানুষের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ

 

গোলাপ মুনীর

যদি আপনার চাকরিটা চলে যায়, তবে বেঁচে থাকার জন্য বাড়িটা বিক্রি করে দিতে পারেন। বাড়িটা হারানোর পরও যদি সংসার না চলে, তবে নিজের কিছু মালামাল বিক্রি করতে পারেন। এভাবে সবকিছু হারিয়ে যদি শুধু শরীরটা থাকে, তবে বিক্রির জন্য অবশিষ্ট আপনার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।

এইতো গত এপ্রিলের প্রথম দুই সপ্তাহে সারা পৃথিবী থেকে অঙ্গ সংস্থান বিশেষজ্ঞরা দু’বার মিলিত হয়েছেন ইউরোপে। তাদের এই সমবেত হওয়ার উদ্দেশ্যে মানুষর বক্ত-মাংশের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিশ্ববাজার পর্যালোচনা। এই বৈঠক দু’টিতে দু’টি মানচিত্র উপস্থাপন করা হয়। একটি মানচিত্রে দেখানো হয় কোন কোন দেশ থেকে বিগত তিন বছর সময়ে অঙ্গ সংস্থানের জন্য রোগীরা এসেছে। এ দেশগুলোর মধ্যে আছি সৌদি আরব, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়া। অন্য মানচিত্রটিতে দেখানো হয়েছে যেসব দেশের মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি হয়েছে। এসব দেশের তালিকায় আছে চীন, পাকিস্তান, কলম্বিয়া ও ফিলিপাইন।

মানচিত্র থেকে দেখা যায়, এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনা-বেচার সংখ্যা হাজার হাজার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দেয়া পরিসংখ্যান মতে, প্রতি বছর আন্তর্জাতিকভাবে শুধু কিডনি বদল হয় প্রায় ৬ হাজার। এর প্রমাণ মিলে দালালদের ও চিকিৎসকদের রিপোর্ট থেকে, ভারতীয় গ্রামগুলো থেকে পাওয়া হিসাব থেকে, জাপানের হাসপাতালগুলোতে পরিচালিত জরিপ থেকে, সিঙ্গাপুর সরকারের রেকর্ডপত্র থেকে এবং মিসরীয় বস্তিবাসীর দেশের ক্ষতের দাগ থেকে। পাকিস্তানের কিছু কিছু গ্রামের মানুষের ৪০ শতাংশই বেঁচে আছে একটি মাত্র কিডনি নিয়ে। উল্লিখিত মেটিংয়ে উপস্থাপিত চার্ট থেকে জানা যায়, এ ক্ষেত্রে অনাত্মীয় ডোনেশান’-এর সংখ্যা ক্রমেই আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানে যারা অন্যের কিডনি গ্রহণ করছে, তাদের দুই-তৃতীয়াংশই বিদেশী। ফিলিপাইনের বেলায়ও চিত্রটা একই।

প্রথম সফল অঙ্গ সংস্থানের কাজটি সম্পন্ন হয়েছিল অর্ধ-শতাব্দী আগে। সেই থেকে প্রথম ডায়াবেটিস, হাইপারটেশন ও অন্যান্য কিডনি ধ্বংসকারী রোগ বিস্তার লাভ করেছে। এসবের অ্যান্টিবায়োটিক বা প্রতিষেধক ওষুধেরও উন্নয়ন সাধনও হয়েছে। তেমনি অন্য দেহের অঙ্গ সংস্থানের পর কোনো ধরনের সংক্রমণ যাতে না ঘটতে পারে, সে ধরনের ওষুধের উন্নয়ন ঘটেছে। এখন অনেক মানুষ অন্যের অঙ্গ নিজের দেহের ধারণ করে বেঁচে আছে। এভাবে অনেককে বাঁচিয়ে রাখাও সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু অঙ্গ দান বা অর্গান ডোনেশন চাহিদা অনুযায়ী তেমনটি রাখাও সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু অঙ্গ দান বা অর্গান ডোনেশন চাহিদা অনুযায়ী তেমনটি বাড়েনি।

একটি অনুমিত এক হিসাব মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ১ লাখ ৭০ হাজার রোগী এখন অঙ্গ সংস্থানের জন্য অপেক্ষমাণদের তালিকায় রয়েছে। ৭০ হাজারেরও বেশি আমেরিকান অপেক্ষায় আছে নিজেদের দেহে কিডনি স্থাপনের জন্য এবং তালিকায় প্রতি বছর যোগ হচ্ছে ৫ হাজার জন। কিডনির অভাবে অনেক মানুষ মারা যাচ্ছেন।

এভাবে অপেক্ষায় না থেকে অনেক রোগী তাদের নিজস্ব ডোনার নিয়োগ করতে শুরু করেছে। এরা এ কাজ শুরু করেছে বিলবোর্ড টানানোর মাধ্যমে। কেউ কেউ শরণাপন্ন হয়েছেন ওয়েব সাইটের।   অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তাদের জন্য এক ধরনের সম্পদ। পেরুবিয়ান, ইউক্রেনিয়ান এবং আমেরিকান হাসপাতালগুলোতে লোকেরা তাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির বিজ্ঞাপন প্রচার করে। গত বছর একজন দক্ষিণ কোরীয় নাট্যকার ঋণের বিপরীতে তার কিডনি জামানত হিসেবে কাজে লাগায়।

রাজনীতিবিদরা এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাজার বশ করার চেষ্টা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ২০ বছর আগে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। ভারতে তা নিষিদ্ধ হয়েছে ১৯৯৪ সালে। চীনে তা নিষিদ্ধ করা হয় গত বছর। কিন্তু জীবন যখন বিপন্ন হয়, তখন আইন আর কেউই মানতে চায় না। আরো বেশি অঙ্গ কেনার বেলায় চিকিৎসকের কিছু বিষয় অবাঞ্ছিত ধরে নিয়েছেন। যেমন ব্রেনডেথ স্ট্যান্ডার্ড, বয়সসীমা এবং গ্রহণকারীর স্বাস্থ্য উপযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট এজেন্সি অর্গান ট্রান্সপ্ল্যাট এজেন্সি তথা অঙ্গ সংস্থান সংস্থাগুলোকে রোগীদের ইচ্ছা অনুযায়ী তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণের অনুমোদন দিয়েছে। কংগ্রেস যদি অর্গান বিক্রি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত পাল্টায়, তবে অনেকে আশা করছেন কয়েদিরা তাদের অর্গান অথবা ম্যারোর বিনিময়ে শাস্তি মেয়াদ কমানোর সুযোগ পাবে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে জাতীয় সরকারগুলো যদি দাম ও মজুরি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তবে এরা নিশ্চয়ই সাম্প্রসারিত জীবন ক্রয়ের বিষয়টিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। গত দুই বছরে ইসরাইলি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায় দ্রুত সেবা যোগানোর উদ্দেশ্যে কলম্বিয়া থেকে চীনে স্থানান্তর করেছে। চীন যদি এর দুয়ার বন্ধ করে দেয়, তবে এরা আবার ব্যবসায়ের স্থান পরিবর্তন করতে পারে। পাকিস্তানে যে দামে কিডনি বিক্রি হয়, চীনা হাসপাতালে এর দাম আরো কয়েকগুণ বেশি। দালালরা দেশে দেশে কিডনির দামের তুলনা করতে পারে। ঠিক যেমনি দামের তুলনা চলে গম কিংবা অন্য কোনো খাদ্যশস্যের।

ইতোমধ্যেই মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা ভেঙে পড়েছে। যে ভারতীয় ২০০৪ সালের সুনামির সময় তাদের জীবন বাঁচানোর সব সহায়-সম্বল হারিয়ে ফেলে, তারা আইন উপেক্ষা করে তাদের কিডনি বিক্রি করেছে। বুলগেরিয়া কঠোর শাস্তি আরোপ করেছে কিডনি ব্যবসায়ীদের ওপর। তারপরও গত বছর ইসরাইল থেকে আসা কিডনি টুরিস্টদের ঠেকাতে পারেনি বুলগেরিয়া। চীনের নিষেধাজ্ঞাও একজন বিবিসি সংবাদদাতাকে লিভার বা যকৃত দানের ব্যাপারে থামাতে পারেনি একটি চীনা হাসপাতালকে। এই তো গত মার্চে একটি কোরীয় পত্রিকা খবর প্রকাশ করে বলেছে, কিডনি বেচার ওপর চীনের নিষেধাজ্ঞা শুধু কোরিয়ায় চীনাদের কিডনি বিক্রির দামটাই বাড়াতে সাহায্য করেছে। থামাতে পারেনি কিডনি বিক্রি।

কিছুসংখ্যক সংস্কারক মনে করেন, এরা অর্গানের ঘাটতি সমস্যার সমাধান করতে এবং এর বাজারও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। তবে তা করতে হবে অর্গান বিক্রি বৈধ করার মাধ্যমে। তাদের সর্বশেষ প্রস্তাব এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ইউরোপীয় বৈঠকে উপস্থাপিত হয়। মিনিসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আর্থার মাতাস। ড. মাতাস বলেন, একদিকে ডিম ও তৈলাক্ত পদার্থ ক্ষতিকর নয়, কিডনি কেনা দেশের অর্থ সাশ্রয় করতে পারে, গরিব মানুষকে কিডনির বদলে টাকা দেয়ার চেয়ে তাদের টাকা দিয়ে খনি কিংবা সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার কোনো অংশে খারাপ কিছু নয়। অপরদিকে তিনি মনে করেন, সরকার কিডনির দাম নির্ধারণসহ কে কিডনি গ্রহণ করবেন তাও নির্ধারণ করবেন।

সৌভাগ্য, জাতীয় স্বাস্থ্যবীমা সমৃদ্ধ যেকোনো দেশ জানে, তাদের জন্য বরাদ্দের চেয়ে বেশি পরিমাণে জনসাধারণ কেনার উপায়টাও কী করে বের করতে হয়। অতএব, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি বৈধ করাই শ্রেয়। তবে কিডনি কেনাবেচা অবাধে চললে ‘কিডনি দান’ অনেকাংশে কমে যাবে। মানুষ তখন স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কিডনি দানে এগিয়ে আসতে চাইবে না।

আমেরিকান, ইসরাইলি, জাপানি ও দক্ষিণ কোরীয়রা বিদেশ চষে বেড়াচ্ছে কিডনি কেনার খোঁজে। কারণ, তাদের নিজেদের মানুষ কিডনি বিক্রিতে ততটা আগ্রহী নয়। এমনকি মৃত্যুর সময়েও এরা কিডনি বিক্রি করতে চায় না। কারো কারো মধ্যে কাজ করে ধর্মীয় বাধা। কেউ কেউ আবার খুঁতখুঁতে। কিডনি দিতে আছে ভয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, তারা যদি হিউম্যান অর্গান বা মানব অঙ্গ সরবরাহ না করে, তবে অন্য কেউ তো করবে। এটা সঠিক, অন্য কেউ না কেউ সরবরাহ করবে।

তবে সেই অন্য কেউ কোনো লাশ নয়। হতে পারে সে একজন জেলে, কিংবা কোনো বেকার, যার দরকার অর্থের এবং সে অর্থ যোগাড় করতে তার কাছে বিকল্প অন্য কোনো পথ নেই। মধ্যস্বত্বভোগী তার বুক চিরে কিডনি নিয়ে যাবে, এর দামের ভগ্নাংশ মাত্র তাকে দেবে। আর এর মাধ্যমে অকেজো করে দিয়ে যাবে। কারণ, ফলোআপ কেয়ার নিতে তাকে আরেকটি বাড়তি খরচের মধ্যে ফেলে দেয়া হয়। যদি কেউ কিডনি দেয়ার পর আবার নিজেকে কাজের উপযোগী রাখতে পারে, তবে সে ব্যক্তি সৌভাগ্যবান।

কাউকে কিডনি বিক্রি থেকে থামানোর সবচেয়ে নিশ্চিত উপায় হচ্ছে, ফ্রি অর্গান দিয়ে বাজারে বন্যা বইয়ে দেয়ার মাধ্যমে কিডনি বিক্রিকে অর্থহীন করে তোলা। আপনি যদি এখনো কিডনি দানে ডোনার কার্ড পূরণ করে না থাকেন, তবে তা এখনই করুন। কারণ, একজন রোগী মৃত লাশ থেকে কোনো কিডনি সংগ্রহ করতে পারে না। তাকে তা সংগ্রহ করতে হয় একজন জীবিত কারো কাছ থেকে।

Leave a Reply

© Copyright 2014-2018, All Rights Reserved ||| Powered By AnyNews24.Com || Developer By Abir-Group

%d bloggers like this:
www.scriptsell.net