নব্বইয়ের দশকের প্রিয় যত টিভি সিরিজ

এই একুশ শতকের আধুনিক বিশ্বে আমরা হাতের কাছেই পাচ্ছি বিনোদনের সবরকমের উপকরণ। ইংলিশ সিরিজ থেকে মুভি-সবই পাওয়া যাচ্ছে ইন্টারনেটে। অথচ একটা সময়ে আমাদের শৈশবে স্রেফ বিটিভিতে সাপ্তাহিক কিছু সিরিজ আর মুভি অফ দ্য উইকে একবার বিদেশী মুভি ছাড়া আর কোন উৎস ছিল না আমাদের। আজকাল বিটিভি প্রায় কেউই দেখে না, এমনকি গ্রামগঞ্জেও ডিশ ক্যাবল কানেকশন অহরহ। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত বাংলায় ডাবিংকৃত বিদেশী টিভি সিরিজগুলো ছিল আমাদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। কালজয়ী সেসব সিরিজ নিয়ে কিছুক্ষণ নস্টালজিক হই চলুনঃ

আলিফ লায়লাঃ বিটিভির সবচেয়ে জনপ্রিয় মেগা সিরিয়াল ছিল আলিফ লায়লা। মালিকা হামিরা, কেহেরমান, জাকালা, সিন্দাবাদ চরিত্রগুলো এখনও মনে করিয়ে দেয় ছোটবেলায় আলিফ লায়লা শুরুর আগে সেই শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনার মুহূর্তগুলোর কথা। আহা! কি শহর কি গ্রাম, সর্বত্র সাড়া পড়ে যেত মানুষের মাঝে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেক জায়গায় তখনো বিদ্যুৎ পৌছায়নি, ব্যাটারী দিয়ে টিভি চালানো হতো। শুক্রবার যেন সেখানে নিয়ে আসতো সাপ্তাহিক উৎসবের আমেজ। দুপুরে খাবার পর পূর্নদৈঘ্য বাংলা ছায়াছবি আর রাতে আটটার বাংলা সংবাদের পর আলিফ লায়লা, এই শিডিউলটা যে কত আকাঙ্ক্ষিত আর প্রতীক্ষিত ছিল, সেটা নব্বইয়ের দশকের কেউ না হলে অনুভব করতে পারবে না। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ছিল আলিফ লায়লা শুরুর সংকেতগুলো। যার একটা ছিল ECONO বলপেনের বিজ্ঞাপন। রাত আটটার পর যতবার ইকোনো বলপেনের বিজ্ঞাপন শুরু হত, ততবার বুকের ভেতর বয়ে যেত এক আলাদা শিহরণ, ভয় এবং তুমুল উত্তেজনা মেশানো সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্বব না। আলিফ লায়লা শুরুর পর ভয়ের দৃশ্যগুলোতে এসে পড়তাম বিশাল ফ্যাঁকড়ায়। দেখতেও ইচ্ছে করছে, আবার ভয়ও লাগছে। শেষ পর্যন্ত দেখা যেত ভয়ে আম্মুর পেছনে তার আঁচলে চোখ ঢেকে আছি, আর একটু পর পর আঁচল থেকে সাবধানে এক চোখ বের করে দেখছি। সিন্দাবাদ, তায়েব, মালিকা হামিরা বা কেহেরমান অথবা চিমাদেব-লিমাদেব, জাকালা, সোফান এজবা ইত্যাদি চরিত্রগুলো অসম্ভব জনপ্রিয় ছিল। মালিকা হামিরার “আকরাম” নামের বিচ্ছু এবং সিন্দাবাদের “সোলেমানি তরবারি” সেই সময় বাচ্চা দের খেলার সাথী হয়ে উঠেছিল। শৈশবে আলিফ লায়লা দেখার স্মৃতিগুলো বড় নস্টালজিক করে দেয়।

দ্য নিউ অ্যাডভেঞ্চার অফ সিন্দাবাদঃ ছোটবেলায় বিটিভিতে জাহাজ নিয়ে ভয়ংকর সব বিপদের মুখোমুখি হয়ে লড়াই করা নাবিক সিন্দাবাদের অ্যাডভেঞ্চার দেখেননি, এমন মানুষ খুব কমই আছেন! মেভ, লঙ্গার, ডোবার এবং ফিরোজ ছিল উল্লেখযোগ্য চরিত্র। সিন্দাবাদের সাথে অকুল সাগরে রহস্য আর রোমাঞ্চের মুখোমুখি হবার জন্য সারা সপ্তাহ আকুল আগ্রহে অপেক্ষায় থাকা শৈশবের সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে বড় ইচ্ছে করে।সিন্দাবাদরুপী Zen Gesner কিংবা মেভরুপী Jacqueline Collen ছিল ছোট ছোট বাচ্চাদের স্বপ্নের নায়ক-নায়িকা!  ডোবার, লঙ্গার, ফিরোজের কথাও না বললেই নয়। বিশেষ করে ডোবারের রসিকতা, ফিরোজের অঘটন ঘটানো আবিস্কার আর লংগারের অনবদ্য ছুরি চালানো ভোলা অসম্ভব। মিভের বাজপাখিটির নাম ছিল ডারমট। কানাডিয়ান এই সিরিয়ালটির IMDB Rating: 6.7। দেখাত প্রতি শুক্রবার। শুরু হত জাম্প কেডসের অ্যাড দিয়ে। অ্যাডটা শুরু হবার সাথে সাথে কার কার বুকের ভেতরের রক্ত ছলকে উঠতো, বলুন তো?

সেই সিন্দাবাদ এখন দেখতে এমন! Zen Gesner কে এখনো ভুলতে পারেননি কে কে?  

হারকিউলিসঃ  গ্রীক মিথোলজির হারকিউলিসকে চেনার বহু আগেই আমরা হারকিউলিসের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম টিভি পর্দায়।অসামান্য এই সিরিয়ালটি যারা দেখেছেন, তারা কখনো Kevin Sorbo কে ভুলতে পারবেন না। কি যে জনপ্রিয় ছিল এই লোক হারকিউলিস হিসেবে! ভাল লাগত তার বন্ধু লোলাউসকেও। তবে হারকিউলিসের সৎ মা ময়ুর পালকের চোখওয়ালী হেরার দৃষ্টিটা মনে পড়লে এখনো শির শির করে ওঠে। আর সেই যে একটা বিশাল সাপ টাইপের প্রাণী দেখাত, যাকে হারকিউলিস তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেলার পর সেটার দুটো মাথা গজাত! কি অদ্ভুতই না ছিল সেই দিনগুলো! এই সিরিজটি শেষ হবার পর অবশ্য ইয়াং হারকিউলিস নামে একটি সিরিজ চলেছিল বিটিভিতে অনেকদিন, কিন্তু হারকিউলিসের ভূমিকায় কেভিন সরবোই দর্শকের কাছে একমাত্রও হারকিউলিস হিসেবে গণ্য হত, রায়ান গজলিংকে কেউ মেনে নিতে পারেনি। সবার কাছে হারকিউলিস মানেই যেন ছিল কেভিন সরবো!

হারকিউলিস তখন, হারকিউলিস এখন! অলটাইম গ্রেইট Kevin Sorbo

নিউ অ্যাডভেঞ্চার অফ রবিনহুডঃ লুটপাট করে গরীবের মাঝে সম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার অসাধারণ সব কীর্তি, সাথে লিটল জন, মেইড ম্যারিয়ন, ফ্রায়ার টাকদের নিয়ে রবিনহুডের বীরত্বগাঁথা—অসাধারণ এ সিরিজটা আজো রোমাঞ্চ জাগায় আমাদের মাঝে। ছোটবেলায় এটা দেখতে দেখতে মনে হত, মানুষের কল্যাণে, তাদের সাহায্য করার জন্য এমন রবিনহুড হতে পারলে জীবনে আর কি লাগে? শেরউড জঙ্গলের অধিপতি রবিন গরিবদের সাহায্য করার জন্য কিভাবে প্রিন্স জনের সাথে যুদ্ধ করত, মনে আছে? আর ফ্রায়ার টেকের হাস্যকর সেসব কাজকর্ম? কিংবা যোদ্ধা হিসেবে ম্যারিয়েন আর লিটিল জনকে? মনে পড়ে? এখানে কিন্তু লর্ড অফ দ্য রিংস খ্যাত  Sir Christopher Lee ও অভিনয় করেছিলেন। বিশেষ করে রবিনহুডের তীর-ধনুকের তীক্ষ্ণ পারদর্শিতা দেখে দেখে তখনকার বাচ্চাদের ভেতর তীরন্দাজ হবার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঠতো। একটু তালেবররা তো অনেকেই খেলার তীর-ধনুক বানিয়ে ফেলতো। যারা খুব ছোটবেলায় এই সিরিজটা দেখতে দেখতে বড় হয়েছে, তাদের মনোজগতে রবিনহুড যে এক বিশাল জায়গা দখল করে আছে, সেটা বলাই বাহুল্য।

টিভি সিরিজ, ম্যাকগাইভার, আলিফ লায়লা, রবিনহুড, রোবোকপ, সিনবাদ

 রবিনহুড তখন, রবিনহুড এখন, অভিনয় করেছিলেন Matthew Porretta

ম্যাকগাইভারঃ কোন জটিল যন্ত্রের যোগাড় ছাড়াই একটা মানুষ স্রেফ উপস্থিত বুদ্ধি আর হাতের কাছে পাওয়া সাধারণ সব জিনিস কাজে লাগিয়ে চরম সব বিপদ থেকে কীভাবে উদ্ধার পান, ম্যাকগাইভারে সেসব দেখে একই সাথে হতভম্ব ও মুগ্ধ হত সবাই। ঘরের ভেতর ম্যাকগাইভার হবার চেষ্টাও করতো অনেকেই! আর ম্যাকগাইভার হবার সেই কারিকুরিতে বেশিরভাগ সময়েই ঘরের জিনিসপত্রের বাজতো বারোটা। কিন্তু তাতে থোরাই কেয়ার করতো বাচ্চা ম্যাকগাইভাররা। তাদের ম্যাকগাইভার হবার রোমাঞ্চকর অভিযান চলতেই থাকতো। খুব শৈশবেই ছোট ছোট বাচ্চাদের ভেতর বিজ্ঞানমনস্কতা আর নতুন কিছু জানার আগ্রহ গড়ে তুলতে ম্যাকগাইভার সিরিজের অবদান অনস্বীকার্য!

অসম্ভব বুদ্ধিমান স্মার্ট সেই ম্যাকগাইভার, Richard Dean Anderson। একটু বুড়িয়ে গেছেন অবশ্য এখন!

রোবোকপঃ “শহরে একজন নতুন নাগরিক এসেছে, যার নাম . . .. . রোবকপ”— প্রতিটি পর্ব শুরুর আগে এভাবেই পরিচয় দেওয়া হত রোবোকপের। রোবোকপের রোবটের মত হাঁটার স্টাইল নকল করতো শিশু-কিশোররা। কী আনন্দময় অভিজ্ঞতা! অ্যালেক্স মারফি নামের এক সাহসী পুলিশ অফিসার এক দুর্ঘটনায় মারা গেলে তার স্মৃতিশক্তি ধরে রেখে সেটি স্থাপন করা হয় এক মেশিনের ভেতর, তৈরি হয় অপরাধীদের ত্রাস রোবোকপ! সেই ছোট্টবেলায় রোবটের চেহারায় একজন মানুষকে কথা বলতে দেখে এবং অপরাধীদের তাড়া করতে দেখে যে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনাময় অনুভূতি তৈরি হত, তার সাথে আজো কোন কিছুর মিল খুঁজে পাই না। ছোট্টবেলার সেই রোবোকপের স্মৃতি এখনো সদাউজ্জ্বল নব্বইয়ের দশকের বাচ্চাদের ভেতর!

সেই রোবোকপ! আধা যন্ত্র আর আধা মানব, অপরাধীদের যম! অভিনয় করেছিলেন Richard Eden

Mysterious Island :  কানাডিয়ান এই টিভি সিরিয়ালটির প্রথম পর্বে দেখিয়েছিল যে, একটা পরিবার বিরাট এক গ্যাস বেলুনে করে পালিয়ে যাচ্ছে। তারা গিয়ে পৌঁছায় এক রহস্যময় দ্বীপে যেখানে কোন মানুষের বসতি নেই। দ্বীপটিতে বাস করত রহস্যময় বিজ্ঞানী ক্যাপ্টেন নেমো যে কিনা লুকিয়ে লুকিয়ে, বিশাল এক টেলেস্কোপ দিয়ে, দ্বীপে আটকে পড়া জোয়ানাদের জীবন যাপন লক্ষ্য করত আর মাঝে মধ্যে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট চালাত তাদের উপর। অদ্ভুত এই সিরিজটি  জুলর্ভানের গল্প অবলম্বনে এই সিরিয়ালটি তৈরি করা হয়েছিল। এই সিরিয়ালটি আবার তুলনা মূলক ভাবে বড়ারা একটু বেশি মজা পেত। কারণ ছোটদের বুঝতে কষ্ট হতো।

Lois & Clark: The New Adventures of Superman: তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সুপারহিরো নিয়ে ক্রেজটা মূলত তৈরি হয়েছিল বিটিভিতে সুপারম্যান দেখে। একটা সময় মানুষ সুপার হিরো বলতে সুপার ম্যানকেই জানত। বাচ্চাদের কাছে রীতিমত আইডল ছিল সে। পর্দার সুপারম্যানকে দেখে লাল গামছা গলায় পেঁচিয়ে বাতাসে উড়িয়ে সুপারম্যান সেজে সারাদিন রীতিমত উড়তে চাইত বাচ্চারা। ক্লার্ক কেন্ট চরিত্রটি ছোটবেলায় প্রবল আকর্ষণের এক চরিত্র ছিল। কারণ এই ক্লার্কই যেকোন বিপদে বা প্রয়োজনের সময় হয়ে যেত সুপারম্যান। তার এই পরিবর্তনটা রীতিমত শ্বাসরুদ্ধকর লাগতো। আর ক্লার্কের ভালোবাসার মানুষ লুইস লেইন ছিল অন্যতম ক্রাশ!

কার কার এখনো সুপারম্যান বলতেই Dean Cain এর ছবি ভেসে ওঠে মনের পর্দায়!

দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ডঃ স্যার আর্থার কোনান ডয়েল-এর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড’ টিভি পর্দায় দেখতে পাওয়ার স্মৃতি নব্বইয়ের দশকের বাচ্চারা ভুলবে না কখনোই। জীবনে সম্ভবত প্রথমবারের মত এমন কিছু দেখছি টিভি পর্দায়, যা কল্পনার সীমাকেও হার মানায়। দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ডে প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরের সাথে দেখা হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ভোলা যে খুবই কঠিন!

স্পেল বাইন্ডারঃ চরম প্রিয় একটা সিরিয়াল ছিল। এখানে যে ট্র্যাভেল মেশিন দেখানো হত, ওইটা যে কতবার নিজের করে পেতে চেয়েছি! ভাবতাম, ওটা পেলে আমার জীবনটাও ওই পিচ্চিদের মত অ্যাডভেঞ্চারাস হত! এই সিরিজের প্রথম সিজন (Spellbinder, IMDB Rating: 7.9) দেখানোর বছরখানেক পর দ্বিতীয় সিজনটি (Spellbinder: Land Of The Dragon Lord, IMDB Rating: 7.7) দেখিয়েছিল। প্রথম সিজন শেষ হওয়ার পর কি যে দুঃখ পেয়েছিলাম! পরে যখন হঠাৎ দেখলাম দ্বিতীয় সিজন শুরু হয়েছে, কি আনন্দটাই না হয়েছিল! স্পেল বাইন্ডার দেখার সময় স্পেস জ্যাকেটগুলো দেখে বড় লোভ লাগতো, মাঝে মাঝে মনে হয় যদি কেউ আমাকে এই জ্যাকেটগুলো দিয়ে দেয়, তবে আমি তাকে আমার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দিয়ে দিতে পারবো!

স্পে্লবাইন্ডার!

আজ এ পর্যন্তই! আগামী দিন নিয়ে আসবো আরও কিছু অসাধারণ সিরিজ নিয়ে, নস্টালজিক হতে!

নব্বইয়ের দশকের প্রিয় যত টিভি সিরিজ

এই একুশ শতকের আধুনিক বিশ্বে আমরা হাতের কাছেই পাচ্ছি বিনোদনের সবরকমের উপকরণ। ইংলিশ সিরিজ থেকে মুভি-সবই পাওয়া যাচ্ছে ইন্টারনেটে। অথচ একটা সময়ে আমাদের শৈশবে স্রেফ বিটিভিতে সাপ্তাহিক কিছু সিরিজ আর মুভি অফ দ্য উইকে একবার বিদেশী মুভি ছাড়া আর কোন উৎস ছিল না আমাদের। আজকাল বিটিভি প্রায় কেউই দেখে না, এমনকি গ্রামগঞ্জেও ডিশ ক্যাবল কানেকশন অহরহ। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত বাংলায় ডাবিংকৃত বিদেশী টিভি সিরিজগুলো ছিল আমাদের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। কালজয়ী সেসব সিরিজ নিয়ে কিছুক্ষণ নস্টালজিক হই চলুনঃ

আলিফ লায়লাঃ বিটিভির সবচেয়ে জনপ্রিয় মেগা সিরিয়াল ছিল আলিফ লায়লা। মালিকা হামিরা, কেহেরমান, জাকালা, সিন্দাবাদ চরিত্রগুলো এখনও মনে করিয়ে দেয় ছোটবেলায় আলিফ লায়লা শুরুর আগে সেই শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনার মুহূর্তগুলোর কথা। আহা! কি শহর কি গ্রাম, সর্বত্র সাড়া পড়ে যেত মানুষের মাঝে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেক জায়গায় তখনো বিদ্যুৎ পৌছায়নি, ব্যাটারী দিয়ে টিভি চালানো হতো। শুক্রবার যেন সেখানে নিয়ে আসতো সাপ্তাহিক উৎসবের আমেজ। দুপুরে খাবার পর পূর্নদৈঘ্য বাংলা ছায়াছবি আর রাতে আটটার বাংলা সংবাদের পর আলিফ লায়লা, এই শিডিউলটা যে কত আকাঙ্ক্ষিত আর প্রতীক্ষিত ছিল, সেটা নব্বইয়ের দশকের কেউ না হলে অনুভব করতে পারবে না। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ছিল আলিফ লায়লা শুরুর সংকেতগুলো। যার একটা ছিল ECONO বলপেনের বিজ্ঞাপন। রাত আটটার পর যতবার ইকোনো বলপেনের বিজ্ঞাপন শুরু হত, ততবার বুকের ভেতর বয়ে যেত এক আলাদা শিহরণ, ভয় এবং তুমুল উত্তেজনা মেশানো সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্বব না। আলিফ লায়লা শুরুর পর ভয়ের দৃশ্যগুলোতে এসে পড়তাম বিশাল ফ্যাঁকড়ায়। দেখতেও ইচ্ছে করছে, আবার ভয়ও লাগছে। শেষ পর্যন্ত দেখা যেত ভয়ে আম্মুর পেছনে তার আঁচলে চোখ ঢেকে আছি, আর একটু পর পর আঁচল থেকে সাবধানে এক চোখ বের করে দেখছি। সিন্দাবাদ, তায়েব, মালিকা হামিরা বা কেহেরমান অথবা চিমাদেব-লিমাদেব, জাকালা, সোফান এজবা ইত্যাদি চরিত্রগুলো অসম্ভব জনপ্রিয় ছিল। মালিকা হামিরার “আকরাম” নামের বিচ্ছু এবং সিন্দাবাদের “সোলেমানি তরবারি” সেই সময় বাচ্চা দের খেলার সাথী হয়ে উঠেছিল। শৈশবে আলিফ লায়লা দেখার স্মৃতিগুলো বড় নস্টালজিক করে দেয়।

দ্য নিউ অ্যাডভেঞ্চার অফ সিন্দাবাদঃ ছোটবেলায় বিটিভিতে জাহাজ নিয়ে ভয়ংকর সব বিপদের মুখোমুখি হয়ে লড়াই করা নাবিক সিন্দাবাদের অ্যাডভেঞ্চার দেখেননি, এমন মানুষ খুব কমই আছেন! মেভ, লঙ্গার, ডোবার এবং ফিরোজ ছিল উল্লেখযোগ্য চরিত্র। সিন্দাবাদের সাথে অকুল সাগরে রহস্য আর রোমাঞ্চের মুখোমুখি হবার জন্য সারা সপ্তাহ আকুল আগ্রহে অপেক্ষায় থাকা শৈশবের সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে বড় ইচ্ছে করে।সিন্দাবাদরুপী Zen Gesner কিংবা মেভরুপী Jacqueline Collen ছিল ছোট ছোট বাচ্চাদের স্বপ্নের নায়ক-নায়িকা!  ডোবার, লঙ্গার, ফিরোজের কথাও না বললেই নয়। বিশেষ করে ডোবারের রসিকতা, ফিরোজের অঘটন ঘটানো আবিস্কার আর লংগারের অনবদ্য ছুরি চালানো ভোলা অসম্ভব। মিভের বাজপাখিটির নাম ছিল ডারমট। কানাডিয়ান এই সিরিয়ালটির IMDB Rating: 6.7। দেখাত প্রতি শুক্রবার। শুরু হত জাম্প কেডসের অ্যাড দিয়ে। অ্যাডটা শুরু হবার সাথে সাথে কার কার বুকের ভেতরের রক্ত ছলকে উঠতো, বলুন তো?

সেই সিন্দাবাদ এখন দেখতে এমন! Zen Gesner কে এখনো ভুলতে পারেননি কে কে?  

হারকিউলিসঃ  গ্রীক মিথোলজির হারকিউলিসকে চেনার বহু আগেই আমরা হারকিউলিসের সাথে পরিচিত হয়েছিলাম টিভি পর্দায়।অসামান্য এই সিরিয়ালটি যারা দেখেছেন, তারা কখনো Kevin Sorbo কে ভুলতে পারবেন না। কি যে জনপ্রিয় ছিল এই লোক হারকিউলিস হিসেবে! ভাল লাগত তার বন্ধু লোলাউসকেও। তবে হারকিউলিসের সৎ মা ময়ুর পালকের চোখওয়ালী হেরার দৃষ্টিটা মনে পড়লে এখনো শির শির করে ওঠে। আর সেই যে একটা বিশাল সাপ টাইপের প্রাণী দেখাত, যাকে হারকিউলিস তলোয়ার দিয়ে কেটে ফেলার পর সেটার দুটো মাথা গজাত! কি অদ্ভুতই না ছিল সেই দিনগুলো! এই সিরিজটি শেষ হবার পর অবশ্য ইয়াং হারকিউলিস নামে একটি সিরিজ চলেছিল বিটিভিতে অনেকদিন, কিন্তু হারকিউলিসের ভূমিকায় কেভিন সরবোই দর্শকের কাছে একমাত্রও হারকিউলিস হিসেবে গণ্য হত, রায়ান গজলিংকে কেউ মেনে নিতে পারেনি। সবার কাছে হারকিউলিস মানেই যেন ছিল কেভিন সরবো!

হারকিউলিস তখন, হারকিউলিস এখন! অলটাইম গ্রেইট Kevin Sorbo

নিউ অ্যাডভেঞ্চার অফ রবিনহুডঃ লুটপাট করে গরীবের মাঝে সম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার অসাধারণ সব কীর্তি, সাথে লিটল জন, মেইড ম্যারিয়ন, ফ্রায়ার টাকদের নিয়ে রবিনহুডের বীরত্বগাঁথা—অসাধারণ এ সিরিজটা আজো রোমাঞ্চ জাগায় আমাদের মাঝে। ছোটবেলায় এটা দেখতে দেখতে মনে হত, মানুষের কল্যাণে, তাদের সাহায্য করার জন্য এমন রবিনহুড হতে পারলে জীবনে আর কি লাগে? শেরউড জঙ্গলের অধিপতি রবিন গরিবদের সাহায্য করার জন্য কিভাবে প্রিন্স জনের সাথে যুদ্ধ করত, মনে আছে? আর ফ্রায়ার টেকের হাস্যকর সেসব কাজকর্ম? কিংবা যোদ্ধা হিসেবে ম্যারিয়েন আর লিটিল জনকে? মনে পড়ে? এখানে কিন্তু লর্ড অফ দ্য রিংস খ্যাত  Sir Christopher Lee ও অভিনয় করেছিলেন। বিশেষ করে রবিনহুডের তীর-ধনুকের তীক্ষ্ণ পারদর্শিতা দেখে দেখে তখনকার বাচ্চাদের ভেতর তীরন্দাজ হবার ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঠতো। একটু তালেবররা তো অনেকেই খেলার তীর-ধনুক বানিয়ে ফেলতো। যারা খুব ছোটবেলায় এই সিরিজটা দেখতে দেখতে বড় হয়েছে, তাদের মনোজগতে রবিনহুড যে এক বিশাল জায়গা দখল করে আছে, সেটা বলাই বাহুল্য।

টিভি সিরিজ, ম্যাকগাইভার, আলিফ লায়লা, রবিনহুড, রোবোকপ, সিনবাদ

 রবিনহুড তখন, রবিনহুড এখন, অভিনয় করেছিলেন Matthew Porretta

ম্যাকগাইভারঃ কোন জটিল যন্ত্রের যোগাড় ছাড়াই একটা মানুষ স্রেফ উপস্থিত বুদ্ধি আর হাতের কাছে পাওয়া সাধারণ সব জিনিস কাজে লাগিয়ে চরম সব বিপদ থেকে কীভাবে উদ্ধার পান, ম্যাকগাইভারে সেসব দেখে একই সাথে হতভম্ব ও মুগ্ধ হত সবাই। ঘরের ভেতর ম্যাকগাইভার হবার চেষ্টাও করতো অনেকেই! আর ম্যাকগাইভার হবার সেই কারিকুরিতে বেশিরভাগ সময়েই ঘরের জিনিসপত্রের বাজতো বারোটা। কিন্তু তাতে থোরাই কেয়ার করতো বাচ্চা ম্যাকগাইভাররা। তাদের ম্যাকগাইভার হবার রোমাঞ্চকর অভিযান চলতেই থাকতো। খুব শৈশবেই ছোট ছোট বাচ্চাদের ভেতর বিজ্ঞানমনস্কতা আর নতুন কিছু জানার আগ্রহ গড়ে তুলতে ম্যাকগাইভার সিরিজের অবদান অনস্বীকার্য!

অসম্ভব বুদ্ধিমান স্মার্ট সেই ম্যাকগাইভার, Richard Dean Anderson। একটু বুড়িয়ে গেছেন অবশ্য এখন!

রোবোকপঃ “শহরে একজন নতুন নাগরিক এসেছে, যার নাম . . .. . রোবকপ”— প্রতিটি পর্ব শুরুর আগে এভাবেই পরিচয় দেওয়া হত রোবোকপের। রোবোকপের রোবটের মত হাঁটার স্টাইল নকল করতো শিশু-কিশোররা। কী আনন্দময় অভিজ্ঞতা! অ্যালেক্স মারফি নামের এক সাহসী পুলিশ অফিসার এক দুর্ঘটনায় মারা গেলে তার স্মৃতিশক্তি ধরে রেখে সেটি স্থাপন করা হয় এক মেশিনের ভেতর, তৈরি হয় অপরাধীদের ত্রাস রোবোকপ! সেই ছোট্টবেলায় রোবটের চেহারায় একজন মানুষকে কথা বলতে দেখে এবং অপরাধীদের তাড়া করতে দেখে যে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনাময় অনুভূতি তৈরি হত, তার সাথে আজো কোন কিছুর মিল খুঁজে পাই না। ছোট্টবেলার সেই রোবোকপের স্মৃতি এখনো সদাউজ্জ্বল নব্বইয়ের দশকের বাচ্চাদের ভেতর!

সেই রোবোকপ! আধা যন্ত্র আর আধা মানব, অপরাধীদের যম! অভিনয় করেছিলেন Richard Eden

Mysterious Island :  কানাডিয়ান এই টিভি সিরিয়ালটির প্রথম পর্বে দেখিয়েছিল যে, একটা পরিবার বিরাট এক গ্যাস বেলুনে করে পালিয়ে যাচ্ছে। তারা গিয়ে পৌঁছায় এক রহস্যময় দ্বীপে যেখানে কোন মানুষের বসতি নেই। দ্বীপটিতে বাস করত রহস্যময় বিজ্ঞানী ক্যাপ্টেন নেমো যে কিনা লুকিয়ে লুকিয়ে, বিশাল এক টেলেস্কোপ দিয়ে, দ্বীপে আটকে পড়া জোয়ানাদের জীবন যাপন লক্ষ্য করত আর মাঝে মধ্যে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট চালাত তাদের উপর। অদ্ভুত এই সিরিজটি  জুলর্ভানের গল্প অবলম্বনে এই সিরিয়ালটি তৈরি করা হয়েছিল। এই সিরিয়ালটি আবার তুলনা মূলক ভাবে বড়ারা একটু বেশি মজা পেত। কারণ ছোটদের বুঝতে কষ্ট হতো।

Lois & Clark: The New Adventures of Superman: তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সুপারহিরো নিয়ে ক্রেজটা মূলত তৈরি হয়েছিল বিটিভিতে সুপারম্যান দেখে। একটা সময় মানুষ সুপার হিরো বলতে সুপার ম্যানকেই জানত। বাচ্চাদের কাছে রীতিমত আইডল ছিল সে। পর্দার সুপারম্যানকে দেখে লাল গামছা গলায় পেঁচিয়ে বাতাসে উড়িয়ে সুপারম্যান সেজে সারাদিন রীতিমত উড়তে চাইত বাচ্চারা। ক্লার্ক কেন্ট চরিত্রটি ছোটবেলায় প্রবল আকর্ষণের এক চরিত্র ছিল। কারণ এই ক্লার্কই যেকোন বিপদে বা প্রয়োজনের সময় হয়ে যেত সুপারম্যান। তার এই পরিবর্তনটা রীতিমত শ্বাসরুদ্ধকর লাগতো। আর ক্লার্কের ভালোবাসার মানুষ লুইস লেইন ছিল অন্যতম ক্রাশ!

কার কার এখনো সুপারম্যান বলতেই Dean Cain এর ছবি ভেসে ওঠে মনের পর্দায়!

দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ডঃ স্যার আর্থার কোনান ডয়েল-এর অবিস্মরণীয় সৃষ্টি ‘দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড’ টিভি পর্দায় দেখতে পাওয়ার স্মৃতি নব্বইয়ের দশকের বাচ্চারা ভুলবে না কখনোই। জীবনে সম্ভবত প্রথমবারের মত এমন কিছু দেখছি টিভি পর্দায়, যা কল্পনার সীমাকেও হার মানায়। দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ডে প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরের সাথে দেখা হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ভোলা যে খুবই কঠিন!

স্পেল বাইন্ডারঃ চরম প্রিয় একটা সিরিয়াল ছিল। এখানে যে ট্র্যাভেল মেশিন দেখানো হত, ওইটা যে কতবার নিজের করে পেতে চেয়েছি! ভাবতাম, ওটা পেলে আমার জীবনটাও ওই পিচ্চিদের মত অ্যাডভেঞ্চারাস হত! এই সিরিজের প্রথম সিজন (Spellbinder, IMDB Rating: 7.9) দেখানোর বছরখানেক পর দ্বিতীয় সিজনটি (Spellbinder: Land Of The Dragon Lord, IMDB Rating: 7.7) দেখিয়েছিল। প্রথম সিজন শেষ হওয়ার পর কি যে দুঃখ পেয়েছিলাম! পরে যখন হঠাৎ দেখলাম দ্বিতীয় সিজন শুরু হয়েছে, কি আনন্দটাই না হয়েছিল! স্পেল বাইন্ডার দেখার সময় স্পেস জ্যাকেটগুলো দেখে বড় লোভ লাগতো, মাঝে মাঝে মনে হয় যদি কেউ আমাকে এই জ্যাকেটগুলো দিয়ে দেয়, তবে আমি তাকে আমার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দিয়ে দিতে পারবো!

স্পে্লবাইন্ডার!

আজ এ পর্যন্তই! আগামী দিন নিয়ে আসবো আরও কিছু অসাধারণ সিরিজ নিয়ে, নস্টালজিক হতে!

© Copyright 2014-2018, All Rights Reserved ||| Powered By AnyNews24.Com || Developer By Abir-Group

%d bloggers like this:
www.scriptsell.net